বছরের বিদায়বেলায় এক শোকাতুর পরিবেশ গ্রাস করেছে পুরো দেশকে। গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে কেঁদেছে কোটি প্রাণ। এ দেশের মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধার যে আসনে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন, তার প্রমাণ মিলেছে বিদায়বেলার সেই অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায়। মানুষ তাদের প্রিয় নেত্রীকে বিদায় জানিয়েছে একরাশ গভীর মমতা আর পরম শ্রদ্ধায়।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যায় এ শোকের কালো মেঘ আরো ঘনীভূত হয়। এই হত্যাকাণ্ড স্তব্ধ করে দিয়েছে আরেকটি নীরব গল্পকে। যে গল্প বলে, মানুষ আর অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ছায়ায় মাথানত করতে রাজি নয়।
চারপাশে এত বেশি অনিশ্চয়তা সহ্য করতে পারেনি দেশের অর্থনীতি। ব্যবসাবাণিজ্যে ধস নামে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হতে থাকে। এর মাঝে চলতে থাকে শ্রমিক আন্দোলন। জুলাই অভ্যুত্থানকে পুঁজি করে একটি অসাধু গোষ্ঠী ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের নামে মিথ্যা মামলা চাপিয়ে দেয়। চাঁদা দাবি করে কোটি কোটি টাকা। টাকা না দিলে বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে থাকে। এসব সংকটের পাশাপাশি শুরু হয় ব্যাংকিং খাতের সংকট। অনেক ব্যাংক মূলধন সুবিধা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এমনকি এলসি সুবিধাও বন্ধ রাখে অনেক ব্যাংক। মূলধন আর কাঁচামালের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় শিল্প কারখানা। বাড়তে থাকে ব্যাংক ঋণের সুদ। একপর্যায়ে কেউ কেউ কারখানা বন্ধ করে দেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবসায়ীরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ চান। সেই সুযোগও দেওয়া হয় না। ভয়াবহ অনিশ্চয়তায় দেশের বেসরকারি খাত মুখ থুবড়ে পড়ে।
অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কেটেছে সাধারণ মানুষেরও। চাকরির অনিশ্চয়তা, বেতনের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা। কারখানা বন্ধের ফলে বেকার হয়ে পড়েন শত শত শ্রমিক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনদুপুরে ছিনতাই-রাহাজানি, চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটতে থাকে।
২০২৫-এর সেই ক্ষতগুলো মুছে যাবে না ঠিকই, তবে সেগুলো বয়ে বেড়াবে এক অপরাজেয় সাহসিকতার পদক হিসেবে। পুরোনো ঘুণে ধরা ব্যবস্থার প্রতিটি ফাটল আজ হয়ে উঠেছে নতুন সৃষ্টির উর্বর ভূমি। যেখানে একসময় দুর্নীতির রাজত্ব ছিল, সেখানে আজ ন্যায়বিচারের চারা রোপিত হচ্ছে; যেখানে ছিল হতাশা, সেখানে ডানা মেলছে নতুন সুযোগ; আর বিভেদের বিষবাষ্প সরিয়ে জেগে উঠছে এক অভূতপূর্ব ঐক্য।
২০২৬ সালের ভোরের প্রথম আলো যখন দিগন্তে উঁকি দেবে, তখন তাকে মনে হবে দীর্ঘ বিরহের পর এক পরম মমতাময়ী সন্ধি। যে রাজপথগুলো একসময় মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হতো, সেখানে এখন পড়বে আগামীর স্বপ্নদ্রষ্টা আর কারিগরদের শান্ত অথচ দৃঢ় পদক্ষেপ।
২০২৬ সালের এই উদয় কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানো নয়; এটি একটি জাতির পুনর্জন্ম। এটি এক পবিত্র অঙ্গীকার যে, উত্তাল সময়ের শিক্ষাগুলোই হবে আগামীর পথপ্রদর্শক। এ জাতি এখন আর শুধু কোনোমতে টিকে থাকাতে সন্তুষ্ট নয়; বরং আমরা এখন অদম্য সাহসে শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে পৌঁছাতে বদ্ধপরিকর।
