ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি দেশের মসজিদ, মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোরআন তিলাওয়াত, আলোচনা সভা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিলসহ নানা ধর্মীয় কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজনে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র জীবন, চরিত্র, মানবিকতা, ন্যায়বোধ ও শান্তির বার্তা তুলে ধরা হচ্ছে।
ইসলামি ঐতিহ্য ও প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, ১২ রবিউল আউয়াল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী তিনি মক্কা নগরীতে কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মানবজাতির জন্য আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসুল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর মাধ্যমে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
একই তারিখে, ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.) ইন্তেকাল করেন বলে প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। ফলে ১২ রবিউল আউয়াল মুসলমানদের কাছে তাঁর জন্ম ও ওফাত—দুই গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতির সঙ্গে জড়িত একটি দিন।
বাংলাদেশের আকাশে গত ১৩ আগস্ট রবিউল আউয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট সফর মাসের ৩০ দিন পূর্ণ হয় এবং ১৫ আগস্ট থেকে ১৪৪৮ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাস গণনা শুরু হয়। সে হিসাবে ১২ রবিউল আউয়াল পড়েছে আজ ২৬ আগস্ট, বুধবার।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সরকার ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় আলোচনা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, কোরআন তিলাওয়াত এবং মহানবী (সা.)-এর জীবন ও কর্মের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন এ উপলক্ষে ‘সিরাতুন্নবী (সা.)’ শীর্ষক বিশেষ কর্মসূচিও আয়োজন করেছে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ দোয়া ও ধর্মীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ঈদে মিলাদুন্নবীর মূল তাৎপর্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা বা আনন্দ-উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করাই এই দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
তিনি মানুষের মধ্যে সাম্য, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা, ক্ষমা, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছেন। এতিম, দরিদ্র, অসহায় ও প্রতিবেশীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যায়, জুলুম, হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দিয়েছেন।
তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—মানুষের প্রতি দয়া ও উত্তম আচরণ। ব্যক্তি থেকে পরিবার, সমাজ থেকে রাষ্ট্র—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার পথ তিনি দেখিয়েছেন।
বর্তমান বিশ্বে নানা ধরনের সংঘাত, হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজনের মধ্যে মহানবী (সা.)-এর শান্তি ও সম্প্রীতির শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ধর্মীয় নেতারা ও বিভিন্ন মহল মানুষের প্রতি সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন।
সরকারি কর্মসূচির মধ্যেও মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আজ সারা দেশে সরকারি ছুটি পালিত হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করছে।
এদিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে মুসলিম সমাজে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও সুন্নাহ অনুসরণের নতুন প্রত্যয় তৈরি হয়। তাঁর দেখানো সত্য, ন্যায়, ক্ষমা, দয়া, আমানতদারি ও মানবিকতার আদর্শ ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল মানুষের কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিবেদিত। তাই তাঁর জন্মের স্মরণ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করার বিষয় নয়; বরং তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ নিজেদের জীবনে ধারণ করারও একটি সুযোগ।
পবিত্র এই দিনে দেশ ও বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে হিংসা-বিদ্বেষমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হচ্ছে।
