রাজধানীর পুরান ঢাকার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ঐতিহ্যবাহী নিউমার্কেট ঘিরে গড়ে উঠেছে চাঁদাবাজদের শক্তিশালী সিন্ডিকেট। নিয়মিত চাঁদা দেওয়ায় মার্কেটের ভেতরে-বাহিরের হাঁটা-চলার ফাঁকা জায়গাগুলোর পুরোটাই এখন হকারদের দখলে।
অভিযোগ উঠেছে, ব্যবসায়ী সমিতির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, ডিএসসিসি ও পুলিশ প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তায় ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে অবৈধ হকার আর চাঁদাবাজরা। অভিযোগ রয়েছে, গভ: নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে নিয়মিত লাখ লাখ টাকার চাঁদা তুলছে তার অনুসারীরা। এর প্রভাবে নিউমার্কেট কেন্দ্রিক রোড ডিভাইডারের ওপরও নানা পণ্যের পসরা নিয়ে নির্বিঘ্নে বসছে হকাররা।
এতে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন মার্কেটটির প্রবীণ ব্যবসায়ী ও বিত্তশালী ক্রেতারা। শুধু তাই নয়, হকারদের অশালীন ব্যবহার আর নিম্নবিত্তের চাপে কমছে বিত্তশালীদের পদচারণা। সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের কারণে প্রতিনিয়তই হারাচ্ছে মার্কেটের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য। অনেক বিত্তবান এমনকি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের পদস্থ কর্মকর্তা ও তাদের পরিবার স্বাচ্ছন্দে কেনাকাটা করতে না পেরে ঐতিহ্যবাহী নিউমার্কেট থেকে মুখ ফিরিয়ে অভিজাত শপিংমলগুলোতে ছুটে যাচ্ছেন। ভুক্তভোগী সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে গভঃ নিউমার্কেটটি তার ঐতিহ্য হারাচ্ছে। ডিএসসিসি ও পুলিশ প্রশাসন বলছে, নিউমার্কেটের ঐতিহ্য ফেরাতে প্রায়ই হকার উচ্ছেদ করা হচ্ছে। অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। শিগগিরই অভিযান চালানো হবে।
সরেজমিনে নিউমার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গভঃ নিউমার্কেট, নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ ব্লক), বনলতা কাঁচা বাজার, নিউ সুপার মুদি মার্কেট (উত্তর ডি ব্লক), চন্দ্রিমা, গাউছিয়া, বলাকা ভবন, নীলক্ষেত মোড়, ইসলামিয়া বই মার্কেট, বাণিজ্য বিতান, বকুশাহ মার্কেট, গাউছুল আযম সমবায় মার্কেট, নূর ম্যানশন, ইসমাইল ম্যানশন, চাঁদনী চক, ধানমন্ডি হকার্স, গ্লোব, নূরজাহান মার্কেট, ঢাকা কলেজ, পেট্রোল পাম্প, প্রিয়াঙ্গন, সায়েন্সল্যাব মোড়, সিটি কলেজ মোড়, এলিফ্যান্ট রোড, বাটা সিগন্যাল মোড়, ইস্টার্ন মল্লিকাসহ মিরপুর রোডের দুই পাশে অন্তত দুই থেকে আড়াই হাজার হকার অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে তৈরি পোশাক ও জুতাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করছেন। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত হকারদের হাঁকডাকে মুখর থাকছে মিরপুর ও এলিফ্যান্ট রোডের বিস্তির্ণ জনপদ। দিন থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত হকারদের অবৈধ দোকানের চাপে ফুটপাতে থাকে না তিল ধারণের ঠাঁই। হকারদের কারণে প্রধান ফুটপাত ও সড়কের একটি অংশ সংকুচিত হয়ে থাকে, ফলে পথচারীদের অনেক সময় ঝুঁকি নিয়েই রাস্তায় হাঁটতে হয়। বিভিন্ন সময়ে ডিএসসিসি ও পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযান চালালেও অল্প কিছুদিন পর তা আবার দখল হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ পথচারীদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। এতে প্রতিদিন সড়কে লেগে থাকে তীব্র যানজট। আর অবৈধ এই দখলের নেপথ্যে রয়েছে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি। প্রতি মাসে এই এলাকায় মোটা অংকের টাকা চাঁদাবাজি হয়। এই চাঁদাবাজির সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা যুক্ত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাত ঘিরে প্রতিদিন অন্তত ৫০০ হকার চৌকি বসিয়ে বা ত্রিপল বিছিয়ে নানান পণ্যের ব্যবসা করছেন। এ খাত থেকে সরকারের কোষাগারে কোন রাজস্ব না গেলেও শ্রেণিভেদে প্রতিটি ভাসমান দোকান বা হকার থেকে তথাকথিত 'লাইনম্যান' ও স্থানীয় চাঁদাবাজ চক্রের মাধ্যমে গড়ে প্রতিদিন দোকানপ্রতি প্রায় ২০০-৫০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর এখন হাত বদল হয়ে ফুটপাতের হকারদের নিয়ন্ত্রণ করছেন ক্ষমতাসীন বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারাই এসব চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। মধ্যম সারির নেতাদের ছত্রছায়া ও পুলিশের সহযোগিতায় এসব চাঁদাবাজি হচ্ছে। আবার কখনো নামে, কখনো বেনামে চাঁদাবাজি করেন নেতারা। বেশিরভাগ নেতাই বেনামে চাঁদাবাজি করেন। আর কখনও ঝামেলায় পড়লে পুলিশকে ব্যবহার করা হয় মীমাংসা জন্য।
পরিচয় গোপন রেখে ক্রেতাবেশে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় বেশ কয়েকজন হকারের। মনির হোসেন নামের এক হকার বলেন, জায়গার পজিশন আর দোকানের ধরণ ও শ্রেণিভেদে এককালীন সালামীর ২০ হাজার থেকে প্রায় ২ আড়াই লাখ টাকা চাঁন্দা না দিলে দোকান পাওয়া যায় না। এছাড়া বেচা বিক্রি থাক আর না থাক, দোকান খুললেই দৈনিক দোকানপ্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা চান্দা দিতে হয়। আবার দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ রাখলে নতুন হকার বসিয়ে দেন চান্দাবাজ নেতারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি জনকণ্ঠকে বলেন, নিউমার্কেটের ফুটপাতে দোকান করার বিনিময়ে প্রতি মাসে নেতাদের দিতে হয় চাঁদা। চাঁদার পরিমাণ দোকান প্রতি ৮-১০ হাজার টাকা। ছোট-বড় দোকানভেদে আবার চাঁদার পরিমাণ হয় ৬-১৮ হাজার টাকা। এসবই অবৈধভাবে ভোগ করছেন ক্ষমতাসীন স্থানীয় বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা। সেই হিসাবে প্রতি মাসে নিউমার্কেট থানা এলাকার ফুটপাত থেকে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা পান নেতারা।
দোকানিদের অভিযোগ, এক সময় এই এলাকায় চাঁদাবাজি করতেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ক্ষমতার পালাবদলে এই চাঁদাবাজির সঙ্গে এবার বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা যুক্ত হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফুটপাতে কেউ কেউ ৩-২৫টি পর্যন্ত দোকান নিয়ন্ত্রণ করেন। প্রতি মাসে এসব দোকান থেকে তারা নির্ধারিত চাঁদা আদায় করেন। তারা জানান, স্থানভেদে চাঁদার পরিমাণও বাড়ে-কমে। গ্লোব মার্কেটের সামনের ফুটপাতের দোকান ১২ হাজার টাকা, চন্দ্রিমার সামনে ৮ হাজার মাসে, নূর জাহানের সামনে মাসে ১৫ হাজার, হকার্স মার্কেটের সামনে দোকান প্রতি ১২-১৫ হাজার, গাউছিয়া মার্কেটের সামনে ১১-১৬ হাজার। প্রতি মাসে প্রতি দোকান থেকে ৪ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করেন নেতারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক হকার ও গভঃ নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির কয়েজন প্রবীণ ব্যবসায়ী জানান, গভঃ নিউমার্কেটের অভ্যন্তরে ফাঁকা জায়গায় এমনকি বৈধ ৪ শতাধিক দোকানের সামনের করিডোরে সব মিলিয়ে অবৈধভাবে প্রায় ৫০০ হকারকে বসিয়ে দিয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সহযোগী অঙ্গ সংগঠনের নেতারা। এর মধ্যে নিউমার্কেট কমিটির নেতা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য এবং থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মকবুল হোসেন সরদারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অন্তত ১৩৬টি ফুটপাতের দোকান। জায়গা ও ব্যবসা অনুযায়ী শ্রেণিভেদে এককালীন দোকানপ্রতি ন্যূনতম এক লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেন মার্কেট কমিটির নেতা এবং থানা বিএনপির সভাপতি মকবুল হোসেন সরদার।
হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গভঃ নিউমার্কেট মসজিদ মার্কেটের উত্তরে লোহার সিড়ির নিচে পতিত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে দোকান করতেন রাজু। সরকার পতনে বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই দোকানের দখল নেন মকবুল হোসেন সরদার। পরে তিনি রাজুর কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। সেই টাকা না দেওয়ায় তার দোকানের মালামাল লুটপাট করে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করেন। এরপর ওই জায়গাটি এককালীন ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা সালামীর চাঁদা নিয়ে সেলিমকে এর দখল বুঝিয়ে দেন ক্ষমতাধর নেতা মকবুল। পরবর্তীতে ওই দোকানটি জনির কাছে মাসিক ২৫ হাজার টাকায় ভাড়া দেন সেলিম। এছাড়া ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের বাইরে এই এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রক হিসাবে আলোচিত নিউমার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুকবুল হোসেন সরদারের নেতৃত্বে ১৮নং ওয়ার্ড নেতা আব্দুল সাত্তার এবং আমির হোসেন ফুটপাতে চাঁদাবাজি করছেন।
স্থানীয় হকাররা আরও জানান, ফুটপাতের ব্যবসা থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন মকবুল হোসেন সরদার। পুলিশের চাঁদাবাজদের তালিকায়ও তার নাম রয়েছে। হকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আমির হোসেন এবং জহির ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হোতা। তাদের ইশারাতেই চলে ফুটপাতের সব অবৈধ কার্যক্রম। তাছাড়া নীলক্ষেতের ইসলামিয়া ও বাকুশাহ্ বই মার্কেটের নিয়ন্ত্রণও রয়েছে মকবুল হোসেন সরদার, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা খান মনির, আব্দুল রাজ্জাক ও ইকবালের হাতেই। এদের প্রত্যেকেই একসময় সামান্য আয়ের মানুষ ছিলেন। এখন তারা কোটি কোটি চাঁদার টাকায় সম্পদের পাহাড় গড়ে আলিশান বাড়ি-গাড়ির মালিক বনে আয়েশি জীবন-যাপন করছেন। এছাড়া হকার ও প্রবীণ ব্যবসায়ীদের মুখে ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় নেতা সাত্তার , সামসু, হাসু, পাগলা শফিক, উজ্জ্বল, বহিষ্কৃত যুবদল নেতা চঞ্চলের নেতৃত্বে চায়না সুমন, মাহাবুব ,বিল্লাল, বাচ্চু, রাহাত, ইসমাইল, আকবর, আমিনুল, সেলিম ও জহিরের নামও উঠে এসেছে।
ভাই নিউমার্কেট এলাকায় মকবুল হোসেন সরদারের নেতৃত্বে অনেকটা প্রকাশ্যেই মব কালচারের স্টাইলে চাঁদাবাজি করছেন যুবদলের সভাপতি মিজান বেপারী, খাঁন মনির ও আত্মগোপনে থাকা পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ক্যাপ্টেন ইমন বাহিনীর সদস্যরা। এদের নেতা সালাউদ্দিন সুজন ও অশিক্ষিত প্রফেসর আলমগীর।
স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন কর্মী জানান, সম্প্রতি গভঃ নিউমার্কেট থেকে হকার তুলে পরিচ্ছন্ন মার্কেট গড়ার উদ্যোগ নেন ব্যবসায়ী মালিক সমিতির কয়েকজন নেতাসহ প্রবীণ ব্যবসায়ীরা। এতে বাধা দেন মকবুলসহ তার অনুসারীরা। এ ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে গত ১০ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯ টায় ধানমন্ডির ৫ নম্বর রোডে স্থানীয় এমপি ও সড়কমন্ত্রীর বাসায় যান মার্কেটের কয়েকজন ব্যবসায়ী। খবর পেয়ে মন্ত্রীর বাসায় ছুটে যান চিহ্নিত চাঁদাবাজ চক্রের মূল হোতা মকবুল হোসেন সরদারসহ তার নেতৃত্বাধীন মতিউর রহমান, মিজানুর রহমান,খাঁন মনির ওরফে জাউরা মনির, জিতু, বডি মাসুদ, আমির হোসেন, মিজান বেপারী সামসু,সাটার সফিক, হাসুসহ আরও কয়েকজন ফুটপাত দখলকারী ও চাঁদাবাজ চক্র। সেখানে মন্ত্রীর বাড়ির প্রধান ফটকের বাইরে মন্ত্রীর সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকা মার্কেটের প্রবীণ ব্যবসায়ী নিউ লাইফ হোমিওপ্যাথি এর মালিক রেজাউল হক পারভেজের সঙ্গে তর্কে জড়ান মকবুল। এ সময় উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতিতে হট্টগোল লাগে। এমন পরিস্থিতিতে মন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে মকবুলসহ অন্যান্যদের দখল-চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ার করেন। এতে কমিটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির সহযোগী সংগঠনের এক কর্মী বলেন, বেশিরভাগ নেতা বেনামে চাঁদা আদায় করেন। নিজের নামে চাঁদাবাজি করেন খুবই কম নেতা। কেউ যাতে তাদের ধরতে না পারে এবং যাতে ক্লিন ইমেজে থাকতে পারেন, এজন্য বেনামে চাঁদাবাজি করেন। এতে ব্যবহার করেন ছাত্রদলের জুনিয়র কর্মীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা মানছেন না ছাত্রদলের পদ ব্যবহার করে ফুটপাত নিয়ন্ত্রণকারী নেতারা। চাঁদাবাজ নেতাদের নিয়ে শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও বিরক্ত।
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাত হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের কাজ ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক। এর বাইরে কোনো কাজ নেই। ছাত্রদলের কেউ কোনো ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকলে আমাদের জানাবেন। কেন্দ্রীয় সংসদের সাথে কথা বলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসের সামনের ফুটপাত দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা হাঁটাচলা করতে পারছে না, স্বাভাবিক চলাচল ও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদ করে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে কলেজ প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিউমার্কেট থানার বিএনপির নেতা মকবুল হেসেনের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী পথচারীরা জানান, ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদ করার পরপরই তারা আবার বসেন। যার কারণে স্থায়ীভাবে ফুটপাত উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। হকার উচ্ছেদে ডিএসসিসি ও পুলিশের ভূমিকা রহস্যজনক। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে সবার আগে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। তারা উচ্ছেদর পর আবার কার নির্দেশে বসছে, সেইগুলো চিহৃিত করে আইনের আওতায় আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানান পথচারীসহ মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।
পুলিশ জানায়, প্রতিদিনই ফুটপাতের চাঁদাবাজদের আটক করছে থানা পুলিশ। অপরাধভেদে পাঠানো হয় জেলেও। কোনো কোনো দিন ১০-১৫ জনকেও ধরছে পুলিশ। তারা বলছে, হকারদের উচ্ছেদে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে না। আর স্থায়ীভাবে ফুটপাত নির্মূল করতে হলে প্রয়োজন ফুটপাত দখলকারীদের পুনর্বাসন করা। যাতে করে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা বৈধ কর্ম করে পথচারীদের চলাফেরায় সুযোগ করে দিতে পারেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নিউমার্কেট থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহ্সীন উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, যাতায়াত সহজ ও হকারদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের অভিযানিক তৎপরতা চলমান রয়েছে। বর্তমানে নিউমার্কেটে পুলিশের ৮টি ফুটপেট্রল, ৪টি মোবাইল টিম ও ১টি কাজ করছে। বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। এছাড়া ট্রাফিক বিভাগও কাজ করছে। নিউমার্কেট এলাকায় ছিনতাই চাঁদাবাজি রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের সামর্থ্য অনুযায়ী ফুটপাত নিয়ন্ত্রণে রাখার জোর চেষ্টা চলমান রয়েছে।
এদিকে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ বলেন, পরিচয় বা অবস্থান যাই হোক না কেন, মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ ও ভূমি দখলবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করতে পারবে না। এমন কোন ঘটনায় পুলিশ জড়িত থাকার অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেন ডিএমপি প্রধান।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, ঢাকা দক্ষিণের ফুটপাত দখলমুক্তকরণে হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিগগিরই নিউমার্কেট এলাকায় এ অভিযান চালানো হবে।
সরেজমিনে নিউমার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গভঃ নিউমার্কেট, নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ ব্লক), বনলতা কাঁচা বাজার, নিউ সুপার মুদি মার্কেট (উত্তর ডি ব্লক), চন্দ্রিমা, গাউছিয়া, বলাকা ভবন, নীলক্ষেত মোড়, ইসলামিয়া বই মার্কেট, বাণিজ্য বিতান, বকুশাহ মার্কেট, গাউছুল আযম সমবায় মার্কেট, নূর ম্যানশন, ইসমাইল ম্যানশন, চাঁদনী চক, ধানমন্ডি হকার্স, গ্লোব, নূরজাহান মার্কেট, ঢাকা কলেজ, পেট্রোল পাম্প, প্রিয়াঙ্গন, সায়েন্সল্যাব মোড়, সিটি কলেজ মোড়, এলিফ্যান্ট রোড, বাটা সিগন্যাল মোড়, ইস্টার্ন মল্লিকাসহ মিরপুর রোডের দুই পাশে অন্তত দুই থেকে আড়াই হাজার হকার অবৈধভাবে ফুটপাত দখল করে তৈরি পোশাক ও জুতাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করছেন। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত হকারদের হাঁকডাকে মুখর থাকছে মিরপুর ও এলিফ্যান্ট রোডের বিস্তির্ণ জনপদ। দিন থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত হকারদের অবৈধ দোকানের চাপে ফুটপাতে থাকে না তিল ধারণের ঠাঁই। হকারদের কারণে প্রধান ফুটপাত ও সড়কের একটি অংশ সংকুচিত হয়ে থাকে, ফলে পথচারীদের অনেক সময় ঝুঁকি নিয়েই রাস্তায় হাঁটতে হয়। বিভিন্ন সময়ে ডিএসসিসি ও পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযান চালালেও অল্প কিছুদিন পর তা আবার দখল হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ পথচারীদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। এতে প্রতিদিন সড়কে লেগে থাকে তীব্র যানজট। আর অবৈধ এই দখলের নেপথ্যে রয়েছে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি। প্রতি মাসে এই এলাকায় মোটা অংকের টাকা চাঁদাবাজি হয়। এই চাঁদাবাজির সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা যুক্ত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাত ঘিরে প্রতিদিন অন্তত ৫০০ হকার চৌকি বসিয়ে বা ত্রিপল বিছিয়ে নানান পণ্যের ব্যবসা করছেন। এ খাত থেকে সরকারের কোষাগারে কোন রাজস্ব না গেলেও শ্রেণিভেদে প্রতিটি ভাসমান দোকান বা হকার থেকে তথাকথিত 'লাইনম্যান' ও স্থানীয় চাঁদাবাজ চক্রের মাধ্যমে গড়ে প্রতিদিন দোকানপ্রতি প্রায় ২০০-৫০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর এখন হাত বদল হয়ে ফুটপাতের হকারদের নিয়ন্ত্রণ করছেন ক্ষমতাসীন বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারাই এসব চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। মধ্যম সারির নেতাদের ছত্রছায়া ও পুলিশের সহযোগিতায় এসব চাঁদাবাজি হচ্ছে। আবার কখনো নামে, কখনো বেনামে চাঁদাবাজি করেন নেতারা। বেশিরভাগ নেতাই বেনামে চাঁদাবাজি করেন। আর কখনও ঝামেলায় পড়লে পুলিশকে ব্যবহার করা হয় মীমাংসা জন্য।
পরিচয় গোপন রেখে ক্রেতাবেশে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় বেশ কয়েকজন হকারের। মনির হোসেন নামের এক হকার বলেন, জায়গার পজিশন আর দোকানের ধরণ ও শ্রেণিভেদে এককালীন সালামীর ২০ হাজার থেকে প্রায় ২ আড়াই লাখ টাকা চাঁন্দা না দিলে দোকান পাওয়া যায় না। এছাড়া বেচা বিক্রি থাক আর না থাক, দোকান খুললেই দৈনিক দোকানপ্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা চান্দা দিতে হয়। আবার দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ রাখলে নতুন হকার বসিয়ে দেন চান্দাবাজ নেতারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি জনকণ্ঠকে বলেন, নিউমার্কেটের ফুটপাতে দোকান করার বিনিময়ে প্রতি মাসে নেতাদের দিতে হয় চাঁদা। চাঁদার পরিমাণ দোকান প্রতি ৮-১০ হাজার টাকা। ছোট-বড় দোকানভেদে আবার চাঁদার পরিমাণ হয় ৬-১৮ হাজার টাকা। এসবই অবৈধভাবে ভোগ করছেন ক্ষমতাসীন স্থানীয় বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা। সেই হিসাবে প্রতি মাসে নিউমার্কেট থানা এলাকার ফুটপাত থেকে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা পান নেতারা।
দোকানিদের অভিযোগ, এক সময় এই এলাকায় চাঁদাবাজি করতেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ক্ষমতার পালাবদলে এই চাঁদাবাজির সঙ্গে এবার বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা যুক্ত হয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফুটপাতে কেউ কেউ ৩-২৫টি পর্যন্ত দোকান নিয়ন্ত্রণ করেন। প্রতি মাসে এসব দোকান থেকে তারা নির্ধারিত চাঁদা আদায় করেন। তারা জানান, স্থানভেদে চাঁদার পরিমাণও বাড়ে-কমে। গ্লোব মার্কেটের সামনের ফুটপাতের দোকান ১২ হাজার টাকা, চন্দ্রিমার সামনে ৮ হাজার মাসে, নূর জাহানের সামনে মাসে ১৫ হাজার, হকার্স মার্কেটের সামনে দোকান প্রতি ১২-১৫ হাজার, গাউছিয়া মার্কেটের সামনে ১১-১৬ হাজার। প্রতি মাসে প্রতি দোকান থেকে ৪ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করেন নেতারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক হকার ও গভঃ নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির কয়েজন প্রবীণ ব্যবসায়ী জানান, গভঃ নিউমার্কেটের অভ্যন্তরে ফাঁকা জায়গায় এমনকি বৈধ ৪ শতাধিক দোকানের সামনের করিডোরে সব মিলিয়ে অবৈধভাবে প্রায় ৫০০ হকারকে বসিয়ে দিয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপি ও সহযোগী অঙ্গ সংগঠনের নেতারা। এর মধ্যে নিউমার্কেট কমিটির নেতা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য এবং থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মকবুল হোসেন সরদারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অন্তত ১৩৬টি ফুটপাতের দোকান। জায়গা ও ব্যবসা অনুযায়ী শ্রেণিভেদে এককালীন দোকানপ্রতি ন্যূনতম এক লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেন মার্কেট কমিটির নেতা এবং থানা বিএনপির সভাপতি মকবুল হোসেন সরদার।
হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গভঃ নিউমার্কেট মসজিদ মার্কেটের উত্তরে লোহার সিড়ির নিচে পতিত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে দোকান করতেন রাজু। সরকার পতনে বিএনপির সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই দোকানের দখল নেন মকবুল হোসেন সরদার। পরে তিনি রাজুর কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। সেই টাকা না দেওয়ায় তার দোকানের মালামাল লুটপাট করে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করেন। এরপর ওই জায়গাটি এককালীন ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা সালামীর চাঁদা নিয়ে সেলিমকে এর দখল বুঝিয়ে দেন ক্ষমতাধর নেতা মকবুল। পরবর্তীতে ওই দোকানটি জনির কাছে মাসিক ২৫ হাজার টাকায় ভাড়া দেন সেলিম। এছাড়া ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের বাইরে এই এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রক হিসাবে আলোচিত নিউমার্কেট থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুকবুল হোসেন সরদারের নেতৃত্বে ১৮নং ওয়ার্ড নেতা আব্দুল সাত্তার এবং আমির হোসেন ফুটপাতে চাঁদাবাজি করছেন।
স্থানীয় হকাররা আরও জানান, ফুটপাতের ব্যবসা থেকে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন মকবুল হোসেন সরদার। পুলিশের চাঁদাবাজদের তালিকায়ও তার নাম রয়েছে। হকারদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮নং ওয়ার্ড বিএনপি নেতা আমির হোসেন এবং জহির ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হোতা। তাদের ইশারাতেই চলে ফুটপাতের সব অবৈধ কার্যক্রম। তাছাড়া নীলক্ষেতের ইসলামিয়া ও বাকুশাহ্ বই মার্কেটের নিয়ন্ত্রণও রয়েছে মকবুল হোসেন সরদার, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা খান মনির, আব্দুল রাজ্জাক ও ইকবালের হাতেই। এদের প্রত্যেকেই একসময় সামান্য আয়ের মানুষ ছিলেন। এখন তারা কোটি কোটি চাঁদার টাকায় সম্পদের পাহাড় গড়ে আলিশান বাড়ি-গাড়ির মালিক বনে আয়েশি জীবন-যাপন করছেন। এছাড়া হকার ও প্রবীণ ব্যবসায়ীদের মুখে ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় নেতা সাত্তার , সামসু, হাসু, পাগলা শফিক, উজ্জ্বল, বহিষ্কৃত যুবদল নেতা চঞ্চলের নেতৃত্বে চায়না সুমন, মাহাবুব ,বিল্লাল, বাচ্চু, রাহাত, ইসমাইল, আকবর, আমিনুল, সেলিম ও জহিরের নামও উঠে এসেছে।
ভাই নিউমার্কেট এলাকায় মকবুল হোসেন সরদারের নেতৃত্বে অনেকটা প্রকাশ্যেই মব কালচারের স্টাইলে চাঁদাবাজি করছেন যুবদলের সভাপতি মিজান বেপারী, খাঁন মনির ও আত্মগোপনে থাকা পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ক্যাপ্টেন ইমন বাহিনীর সদস্যরা। এদের নেতা সালাউদ্দিন সুজন ও অশিক্ষিত প্রফেসর আলমগীর।
স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন কর্মী জানান, সম্প্রতি গভঃ নিউমার্কেট থেকে হকার তুলে পরিচ্ছন্ন মার্কেট গড়ার উদ্যোগ নেন ব্যবসায়ী মালিক সমিতির কয়েকজন নেতাসহ প্রবীণ ব্যবসায়ীরা। এতে বাধা দেন মকবুলসহ তার অনুসারীরা। এ ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে গত ১০ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯ টায় ধানমন্ডির ৫ নম্বর রোডে স্থানীয় এমপি ও সড়কমন্ত্রীর বাসায় যান মার্কেটের কয়েকজন ব্যবসায়ী। খবর পেয়ে মন্ত্রীর বাসায় ছুটে যান চিহ্নিত চাঁদাবাজ চক্রের মূল হোতা মকবুল হোসেন সরদারসহ তার নেতৃত্বাধীন মতিউর রহমান, মিজানুর রহমান,খাঁন মনির ওরফে জাউরা মনির, জিতু, বডি মাসুদ, আমির হোসেন, মিজান বেপারী সামসু,সাটার সফিক, হাসুসহ আরও কয়েকজন ফুটপাত দখলকারী ও চাঁদাবাজ চক্র। সেখানে মন্ত্রীর বাড়ির প্রধান ফটকের বাইরে মন্ত্রীর সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকা মার্কেটের প্রবীণ ব্যবসায়ী নিউ লাইফ হোমিওপ্যাথি এর মালিক রেজাউল হক পারভেজের সঙ্গে তর্কে জড়ান মকবুল। এ সময় উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডা ও হাতাহাতিতে হট্টগোল লাগে। এমন পরিস্থিতিতে মন্ত্রী ক্ষুব্ধ হয়ে মকবুলসহ অন্যান্যদের দখল-চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর হুঁশিয়ার করেন। এতে কমিটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির সহযোগী সংগঠনের এক কর্মী বলেন, বেশিরভাগ নেতা বেনামে চাঁদা আদায় করেন। নিজের নামে চাঁদাবাজি করেন খুবই কম নেতা। কেউ যাতে তাদের ধরতে না পারে এবং যাতে ক্লিন ইমেজে থাকতে পারেন, এজন্য বেনামে চাঁদাবাজি করেন। এতে ব্যবহার করেন ছাত্রদলের জুনিয়র কর্মীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের এক নেতা বলেন, শীর্ষ পর্যায় থেকে বারবার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা মানছেন না ছাত্রদলের পদ ব্যবহার করে ফুটপাত নিয়ন্ত্রণকারী নেতারা। চাঁদাবাজ নেতাদের নিয়ে শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও বিরক্ত।
ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাত হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের কাজ ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক। এর বাইরে কোনো কাজ নেই। ছাত্রদলের কেউ কোনো ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকলে আমাদের জানাবেন। কেন্দ্রীয় সংসদের সাথে কথা বলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসের সামনের ফুটপাত দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা হাঁটাচলা করতে পারছে না, স্বাভাবিক চলাচল ও পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ফুটপাতের দোকান উচ্ছেদ করে ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে কলেজ প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিউমার্কেট থানার বিএনপির নেতা মকবুল হেসেনের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী পথচারীরা জানান, ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদ করার পরপরই তারা আবার বসেন। যার কারণে স্থায়ীভাবে ফুটপাত উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। হকার উচ্ছেদে ডিএসসিসি ও পুলিশের ভূমিকা রহস্যজনক। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে সবার আগে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। তারা উচ্ছেদর পর আবার কার নির্দেশে বসছে, সেইগুলো চিহৃিত করে আইনের আওতায় আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানান পথচারীসহ মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।
পুলিশ জানায়, প্রতিদিনই ফুটপাতের চাঁদাবাজদের আটক করছে থানা পুলিশ। অপরাধভেদে পাঠানো হয় জেলেও। কোনো কোনো দিন ১০-১৫ জনকেও ধরছে পুলিশ। তারা বলছে, হকারদের উচ্ছেদে সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে না। আর স্থায়ীভাবে ফুটপাত নির্মূল করতে হলে প্রয়োজন ফুটপাত দখলকারীদের পুনর্বাসন করা। যাতে করে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা বৈধ কর্ম করে পথচারীদের চলাফেরায় সুযোগ করে দিতে পারেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নিউমার্কেট থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহ্সীন উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, যাতায়াত সহজ ও হকারদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশের অভিযানিক তৎপরতা চলমান রয়েছে। বর্তমানে নিউমার্কেটে পুলিশের ৮টি ফুটপেট্রল, ৪টি মোবাইল টিম ও ১টি কাজ করছে। বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। এছাড়া ট্রাফিক বিভাগও কাজ করছে। নিউমার্কেট এলাকায় ছিনতাই চাঁদাবাজি রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের সামর্থ্য অনুযায়ী ফুটপাত নিয়ন্ত্রণে রাখার জোর চেষ্টা চলমান রয়েছে।
এদিকে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ বলেন, পরিচয় বা অবস্থান যাই হোক না কেন, মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ ও ভূমি দখলবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করতে পারবে না। এমন কোন ঘটনায় পুলিশ জড়িত থাকার অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেন ডিএমপি প্রধান।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, ঢাকা দক্ষিণের ফুটপাত দখলমুক্তকরণে হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিগগিরই নিউমার্কেট এলাকায় এ অভিযান চালানো হবে।
