অষ্টগ্রামে মাদক ব্যবসা ও অপরাধচক্র, পুলিশের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলায় মাদক ব্যবসা, চুরি, চাঁদাবাজি, জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চক্রের সঙ্গে পুলিশের কয়েকজন অসাধু সদস্য, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কথিত সাংবাদিক পরিচয়ধারী কিছু ব্যক্তির যোগসাজশ রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে এএসআই আবু তালেব, এএসআই শোভন ঘোষ, কনস্টেবল নাঈম, কনস্টেবল সুমন, অষ্টগ্রাম থানার তৎকালীন ওসি মোহাম্মদ রুকনুজ্জামান এবং কথিত সাংবাদিক নাদিরুজ্জামান আজমলসহ কয়েকজনের নাম উঠে এসেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধীরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে।

বিভিন্ন তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে অভিযোগ উঠেছে, অষ্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছে। এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপের অভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকজন কথিত ও চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং অপরাধচক্রের সদস্যদের সঙ্গে এএসআই আবু তালেব (বর্তমানে কুলিয়ারচর থানায় কর্মরত), এএসআই শোভন ঘোষ, কনস্টেবল নাঈম ও কনস্টেবল সুমনকে প্রায়ই প্রকাশ্যে চলাফেরা করতে দেখা যায়। তাঁদের থানায় যাতায়াত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠাবসার বিষয়টিও স্থানীয়দের নজরে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এ কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, একটি প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, ওয়াসিম, সানি, শাহজাহান, শহীদ, হেলাল ও আজমলসহ কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা, চুরি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে একাধিক মামলা ও অভিযোগ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

ভুক্তভোগী সুমাইয়া চ্যানেল সেভেন টিভিকে বলেন, “আমি একসময় অষ্টগ্রাম থানার হয়ে কাজ করতাম। অনেক মাদক আসামিকেও ধরিয়ে দিয়েছি। তারপরও আমি নিজের জন্য থানা থেকে কোনো সুবিধা পাইনি। আমার প্রতিবেশী আলমগীর দীর্ঘদিন যাবৎ বিভিন্নভাবে আমাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। এ বিষয়ে আমি আদালতে মামলা করলে তার তদন্তের দায়িত্ব অষ্টগ্রাম থানার এসআই ফরিদকে দেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পাঠানো হয়নি। আলমগীরের বিষয়ে থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন।”

অন্যদিকে, ভুক্তভোগী সুরাইয়া চ্যানেল সেভেন টিভিকে জানান, “আমি অতি দরিদ্র। তাই প্রশাসনের বিষয়ে কিছু বলতে গেলে আমার ক্ষতি হবে।”

এ ছাড়া হ্যাপি-মজনুদের মতো আরও অনেক ভুক্তভোগী চ্যানেল সেভেন টিভিকে জানান, অষ্টগ্রাম থানাজুড়ে মাদকের সংশ্লিষ্টতা ও অনিয়ম রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, “অষ্টগ্রাম থানার প্রশাসন রক্ষক নয়, হয়ে উঠেছে ভক্ষক।”

অষ্টগ্রামে মাদক ব্যবসা ও অপরাধচক্র, পুলিশের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রে অষ্টগ্রাম থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ (ওসি), পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ রুকনুজ্জামানের (বিপি নম্বর: ৭৮০৪১১২৯১৬) বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধ ও আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক ব্যবসায়ী, চোর, মারামারির ঘটনায় অভিযুক্ত, জমি দখলকারী কিংবা বিভিন্ন মামলার আসামিদের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মাদক ব্যবসায়ীদের ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা, অন্যান্য আসামির ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং মামলা এফআইআর করার ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো মামলা মিথ্যা হলে ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।

এ ছাড়া অভিযোগকারীদের দাবি, আদমপুর ও আব্দুল্লাহপুর এলাকায় বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের বিষয় থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজেই সেখানে গিয়ে গোপনে অর্থ গ্রহণ করতেন।

মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগের জন্য আলাদা মোবাইল ফোন ব্যবহার এবং হোয়াটসঅ্যাপে কথোপকথনের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডে তাঁর বডিগার্ড হিসেবে পরিচিত কনস্টেবল আলমগীর, যিনি বর্তমানে হাইওয়েতে বদলিরত, এবং মুন্সি নাঈমের নামও উঠে এসেছে।

তাঁদের দাবি, এএসআই আবু তালেব (কুলিয়ারচর থানায় বদলিরত), এএসআই শোভন ঘোষ, কনস্টেবল সুমন ও নাঈম বর্তমানে অষ্টগ্রাম থানায় কর্মরত রয়েছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, অষ্টগ্রাম থানার পূর্ববর্তী ড্রাইভার আক্তারুজ্জামান একটি বটগাছ বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ নিজের কাছে রেখে দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, আলমগীর, ড্রাইভার নায়েক মোবারক ও মুন্সি নাঈমকে ওই অর্থের ভাগ না দেওয়ায় আক্তারুজ্জামানকে অষ্টগ্রাম থেকে হোসেনপুরে বদলি করে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

অষ্টগ্রামে মাদক ব্যবসা ও অপরাধচক্র, পুলিশের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

স্থানীয় সূত্রে এস এম সানি (৩৪), পিতা এস এম রোহুজ উদ্দিন, গ্রাম খান ঠাকুর দিঘিরপাড়, সদর ইউনিয়ন—এই পরিচয়ের একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা ও মাদক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।

এস এম শাহীন নামে পরিচিত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন মহলে প্রভাব বিস্তার করেন এবং অপরাধচক্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, মোঃ ওয়াসিম (৩৬), পিতা মৃত শাহ হোসেন, গ্রাম খাঁন ঠাকুর দিঘিরপাড়, অষ্টগ্রাম—তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা ও অন্যান্য অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন অঞ্চলে মাদক ব্যবসার একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনার সঙ্গে তিনি জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

শাহজাহান মিয়া (৩৫), পিতা জুমরত আলী, গ্রাম আলমদীঘির পাড়—তাঁর বিরুদ্ধেও মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিভিন্নভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের সহায়তা করে আসছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, মোঃ শহীদ ওরফে সৈয়দ (৩৪), পিতা ওদু মিয়া, গ্রাম আলমদীঘির পাড়—তাঁর বিরুদ্ধে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। তিনি মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অষ্টগ্রামে মাদক ব্যবসা ও অপরাধচক্র, পুলিশের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

অষ্টগ্রাম থানার এএসআই (নিঃ) মোঃ আবু তালেবকে ঘিরেও নানা অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, তাঁকে একাধিক অভিযুক্ত ও চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে নিয়মিত চলাফেরা করতে দেখা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন ও প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে মাদকদ্রব্য আনা-নেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সহায়তা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে রাতের অন্ধকারে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:
  • শারুখ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২৬ হাজার টাকা নিয়ে তাঁকে রাতের অন্ধকারে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
  • সাইদুল নামের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
  • ইমন ও আমান নামের দুই ব্যক্তির কাছ থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
  • বর্তমানে অষ্টগ্রাম থানার অধীনে যারা মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছেন, তাঁদের কাছ থেকে মাসোয়ারা নির্ধারণ করে নেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কিছু ব্যক্তিকে আটকের পর রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের মুক্তির জন্য থানায় তদবির ও সুপারিশ করেন।

এ ধরনের তদবির অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, অষ্টগ্রাম থানার বিএনপির সোহেল নামের একজন নেতা মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য সুপারিশ করতে থানায় যান। তিনি মাদক ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করছেন বলেও জানা যায়।


এদিকে, সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, সুপারিশ ও বিভিন্ন অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে মোঃ নাদিরুজ্জামান আজমল নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের একাংশ তাঁকে কথিত হলুদ সাংবাদিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রকৃত সাংবাদিকতার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রুকনুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন।

অষ্টগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-এর বক্তব্যসহ সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে জানতে অষ্টগ্রাম সার্কেলের সিনিয়র এএসপি মোঃ দিদারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি চ্যানেল সেভেন টিভিকে বলেন,

এ সংক্রান্তে একটি অভিযোগের কপি পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে এসেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন আছে। ওসি এবং অন্যান্য অফিসারের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তদন্ত শেষ হলে বলা যাবে। তদন্ত শেষে তদন্তের ফলাফল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করা হবে।