নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কের সামনের সড়কে চাঁদাবাজদের হামলায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) ১২ জন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এর মধ্যে গুরুতর আহত ছয় জনকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি এবং অন্যান্যদের নরসিংদী সদর ও মাধবদীর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ন্যাক্কারজনক এ ঘটনায় ঘটনার দিন রাতেই দুই জনকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) উপজেলার কবিরাজপুর নিবাসী মো. মো. হাবিল মিয়ার সন্ত্রাসীপুত্র মো. রিফাত মিয়াকে আটক করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ এ পর্যন্ত অভিযুক্ত ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে সাংবাদিকদের ওপর হামলার এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে ডিইউজে, ডিআরইউ, র্যাক, ট্র্যাব ও ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম, ডিজেসিসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কের সামনের সড়কে সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজদের সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন বিভিন্ন প্রিন্ট, অনলাইন ও টিভি মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা। ঘটনার দিন পূর্ব নির্ধারিত অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে অপরাধ বিষয়ক পেশাদার সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) আয়োজিত ফ্যামিলি ডে আয়োজন ছিল। অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যায় বাসে করে ঢাকায় ফেরার পথে সাংবাদিকদের বহনকারী বাস থামিয়ে চাঁদা দাবি করে স্থানীয় একদল চাঁদাবাজ। চাঁদাবাজরা বাসপ্রতি ২০০ টাকা করে চাঁদা তুললেও এর বিপরীতে চাঁদার রশিদ চাইলে তর্কে জড়ায় চাঁদাবাজরা। এ ঘটনার প্রতিবাদ জানালে স্থানীয় চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা ফোনে নিজেদের দলবল ডেকে এনে লোহার রড, লাঠিসোঁটা, দেশিয় ধারালো ছোরা-চাপাতি নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর অতর্কিতভাবে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। একই সঙ্গে একটি বাসে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর শেষে আগুন লাগানোর চেষ্টা চালায়। হামলায় আহত সাংবাদিকরা হলেন- বাংলাভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি এসএম ফয়েজ, খবর সংযোগের শহিদুল ইসলাম শাহেদ, জিটিভি’র মহসিন কবির, বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাখাওয়াত কাওসার, নয়া দিগন্তের মনির হোসেন, নিউ নেশনের শিমুল পারভেজ ও ক্র্যাবের অফিস স্টাফ লালসহ অন্তত ১২ জন।
আহত সাংবাদিক এসএম ফয়েজ জানান, নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) ফ্যামেলি ডে-২০২৬ শেষে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বাসযোগে ঢাকায় ফিরছিলেন পরিবারসহ সাংবাদিকরা। পার্কের সামনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে স্থানীয় একদল চাঁদাবাজ রাস্তার পাশে সাংবাদিকদের বাস পার্কিং করায় চাঁদা দাবি করে। কিছু কিছু বাসের নির্ধারিত বাসপ্রতি ২০০ টাকা করে চাঁদা নিলেও চাঁদার রশিদ দিতে অনাগ্রহী চাঁদাবাজরা। এ সময় সাংবাদিকরা এর প্রতিবাদ করলে তাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে চাঁদাবাজরা হামলা চালায় এতে ১২ জন সাংবাদিক আহত হন। আহতদের মাধবদীর বেসরকারি হাসপাতাল ও নরসিংদী সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কের সামনে সাংবাদিকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) রাতে এক যৌথ বিবৃতিতে কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষ থেকে ডিআরইউ’র সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল এ নিন্দা জানান। হামলায় আহত সাংবাদিকদের বরাত দিয়ে ডিআরইউ নেতৃবৃন্দ জানায়, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) ‘ফ্যামিলি ডে-২০২৬’ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকরা বাসযোগে ঢাকায় ফেরার সময় নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্কের সামনে আমাদের বাসগুলো পার্ক করা হয়। এ সময় স্থানীয় একদল সন্ত্রাসী রাস্তার পাশে বাস পার্কিংয়ের অজুহাতে বিধিবহির্ভূত চাঁদা দাবি করে। সাংবাদিকরা এর প্রতিবাদ জানালে একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় ১২ জন সাংবাদিক আহত হন। এরমধ্যে ছয়জনের অবস্থা গুরুতর। বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের হামলা পরিকল্পিত এবং চাঁদা আদায়ের প্রতিবাদে হামলার ঘটনা প্রমাণ করে সন্ত্রাসীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ডিআরইউ নেতারা আহত সাংবাদিকদের দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। ডিআরইউ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, হামলার সঙ্গে জড়িত সব সন্ত্রাসী ও তাদের মদদদাতাদের দ্রুত চিহ্নিত করে গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সারাদেশে দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। বিবৃতিতে তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি সারাদেশের সাংবাদিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হব।
একইভাবে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন পেশাদার সাংবাদিকদের সংগঠন ডিইউজে, ক্র্যাব, ডিজেসি, র্যাক, ট্র্যাব ও ল’ রিপোর্টার্স ফোরামসহ বিভিন্ন সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
পার্কে বেড়াতে আসা ভ্রমণপিপাসুরা জানান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদীর এমন ব্যস্ততম সড়কে ড্রীম হলিডে পার্ক স্থাপন করায় বিনোদনপ্রেমীদের চাহিদা দিন দিন বাড়ছেই। কিন্তু পার্ক কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও অনিয়ম অব্যবস্থাপনায় দেশের দূর দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের বহনকারী বাস পার্কিং করার পর্যাপ্ত জায়গা না রেখে ব্যবসা পরিচালনা করায় এমন ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। এতে পার্ক কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে স্থানীয় লাঞ্ছিত হচ্ছেন দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) স্থানীয় চাঁদাবাজরা সাংবাদিকদের ওপর যেভাবে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে, তার দায় এড়াতে পারেন না ড্রীম হলিডে পার্ক কর্তৃপক্ষ।
ক্র্যাব সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল ও সাধারণ সম্পাদক এমএম বাদশাহ্ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দিবাগত মধ্যরাতের পর নরসিংদীর মাধবদী থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও বেশ কয়েকজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং-২৪, তাং-২৭/০১/২০২৬। ধারা- ১৪৩/৩২৩/৩২৪/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/৪২৭/৫০৬(।।)৩৪ পেনাল কোড।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নরসিংদী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে ঘটনার রাতেই অভিযুক্ত আলাল সরকার ও রনি ওরফে রুবেল নামের দুই জনকে আটক করে থানায় নিয়েছে। এছাড়া মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) উপজেলার কবিরাজপুর নিবাসী মো. হাবিল মিয়ার সন্ত্রাসীপুত্র মো. রিফাত মিয়াকে আটক করে থানায় পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে এ পর্যন্ত ৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের আটকের চেষ্টা চলছে। আহত সাংবাদিকদের চিকিৎসার জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
