বঙ্গভবনের দেড় বছরের ঝড়: রাষ্ট্রপতির মুখে অন্তরালের কাহিনি
দীর্ঘ দেড় বছর—রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন-এর ভাষায়, সময়টা ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। বঙ্গভবনের ভেতরে অবস্থান করেই তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে রাজনৈতিক চাপ, বিক্ষোভ, অপসারণের উদ্যোগ এবং নানা ধরনের ষড়যন্ত্র। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি অকপটে বলেন, এই সময়টাকে সুখকর বলা যাবে না; বরং এটি ছিল সহনশীলতা ও মানসিক দৃঢ়তার এক কঠিন পরীক্ষা।
রাষ্ট্রপতির দাবি, তাঁকে অসাংবিধানিক উপায়ে সরিয়ে দেওয়ার একাধিক পরিকল্পনা হয়েছিল। তবে শুরু থেকেই তিনি নিজের অবস্থানে অনড় ছিলেন। তাঁর ভাষায়, “যে কোনো পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখব—এ সিদ্ধান্ত থেকে আমি একচুলও সরে যাইনি।” তিনি আরও বলেন, তাঁর ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, তা অন্য কেউ সামাল দিতে পারত কি না, সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান।
২২ অক্টোবর ২০২৪: উত্তাল এক রাত
২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের ঘটনা পরিস্থিতিকে চরমে তোলে। বিভিন্ন দল, মঞ্চ ও সংগঠনের নামে হঠাৎ কর্মসূচি দেখা দেয়। রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, একই ধরনের কিছু লোকজন বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভিন্ন পরিচয়ে সক্রিয় ছিল এবং রাতারাতি সংগঠিত হয়েছিল।
সেই সময় সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। উত্তেজনার মধ্যে এক তরুণী কাঁটাতারের বেড়া টপকে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। রাষ্ট্রপতির মতে, এটি ছিল পরিকল্পিত নাটকীয়তা। সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের পর তিনি পড়ে থাকেন এবং ক্যামেরাম্যানকে ছবি তুলতে আহ্বান জানান—যা দিয়ে পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা হতে পারত বলে রাষ্ট্রপতির দাবি। পরে মহিলা পুলিশ ও সেনাসদস্যরা তাঁকে সরিয়ে নেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ওই রাত ছিল তাঁর জন্য বিভীষিকাময়। ফ্লাইওভার দিয়ে বিভিন্ন যানবাহনে করে লোকজন আনা হচ্ছিল। তাঁর মতে, গণভবনের মতো বঙ্গভবনেও লুটপাটের চেষ্টা হতে পারত। তিনি বলেন, “আমরা ঘরেই ছিলাম। পালানোর প্রশ্নই ওঠে না।” শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী এপিসি ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
রাত ১২টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করে জানান, যারা ঘেরাও করেছে তারা তাঁদের লোক নয় এবং বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে; পরিস্থিতি ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চলছে। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত বিক্ষোভকারীদের সরাতে সময় লাগে। বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দলে রাষ্ট্রপতির অপসারণের দাবিতে সভা চলতে থাকে।
অপসারণের রাজনৈতিক উদ্যোগ ও অবস্থান
রাষ্ট্রপতির মতে, গণ-অভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপেই তাঁকে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, কেবলমাত্র দলগুলো চাইলে তিনি অপসারিত হতে পারেন; অন্যথায় নয়। বিষয়টি নিয়ে দুটি গ্রুপে বিভক্তি দেখা দেয়। বিভিন্ন দল ও জোটের সঙ্গে বৈঠক হয়। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, যেকোনো সময় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হলেই তাঁকে সরানোর পথ তৈরি হতে পারত।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও তাদের জোটসঙ্গীরা তাঁর প্রতি সমর্থন জানায় এবং অসাংবিধানিক পথে রাষ্ট্রপতি অপসারণের বিরোধিতা করে। তাঁর ভাষায়, বিএনপি ও তাদের জোট একদিকে, আরেকটি পক্ষ অন্যদিকে অবস্থান নেয়। শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি সফল হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ ও সাবেক প্রধান বিচারপতি প্রসঙ্গ
রাষ্ট্রপতির অভিযোগ, রাজনৈতিক পর্যায়ে ব্যর্থ হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকেও তাঁকে সরানোর চেষ্টা হয়। এমনকি একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তাঁর স্থানে বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সরকারের একজন উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট বিচারপতির সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। তবে ওই বিচারপতি নাকি স্পষ্ট জানান, অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদে বসা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণেই উদ্যোগটি ভেস্তে যায় বলে রাষ্ট্রপতির দাবি।
মনোবল ও সমর্থন
রাষ্ট্রপতি বলেন, একা তাঁর পক্ষে মনোবল ধরে রাখা কঠিন হতো। বিএনপির শীর্ষ পর্যায় তাঁকে সাংবিধানিক অবস্থানে অবিচল থাকার আহ্বান জানায়। পাশাপাশি তিন বাহিনীর পক্ষ থেকেও সর্বোচ্চ সমর্থন পান বলে তিনি জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর পরাজয় সশস্ত্র বাহিনীর মনোবলেও আঘাত করবে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আবারও অপসারণের চেষ্টা হলে তিন বাহিনীর প্রধানরা আপত্তি জানান বলে তাঁর দাবি।
তিনি আরও বলেন, কূটনৈতিক মহলেও তাঁকে অসাংবিধানিকভাবে সরানোর পক্ষে সমর্থন ছিল না।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক ও সমন্বয়ের অভাব
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করেননি। সংবিধান অনুযায়ী বিদেশ সফর শেষে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর আমলে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হলেও অনেকগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন রাষ্ট্রপতি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্বাচনের আগে হওয়া চুক্তি সম্পর্কেও তাঁকে অবহিত করা হয়নি বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, এটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার লঙ্ঘন।
বিদেশ সফর বাতিল ও কূটনৈতিক ইস্যু
রাষ্ট্রপতি জানান, কসোভো ও কাতারের আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সফরে যেতে দেওয়া হয়নি। কাতারের আমিরের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে খসড়া চিঠি পাঠানো হয়, যেখানে ‘রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত’ থাকার কথা উল্লেখ ছিল। তিনি এতে প্রশ্ন তুলে পাল্টা চিঠিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
আরও একটি ঘটনায়, বিদেশে বাংলাদেশ হাইকমিশনগুলো থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরিয়ে ফেলা হয়। এটি তিনি অপমানজনক ও সম্ভাব্য অপসারণের পূর্বাভাস হিসেবে দেখেছেন।
প্রেস উইং প্রত্যাহার ও জনসম্মুখে উপস্থিতি সীমিতকরণ
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচিত কমিটির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের ছবি প্রকাশের পর বঙ্গভবনের প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি ও অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারিকে প্রত্যাহার করা হয়। রাষ্ট্রপতির মতে, তাঁকে জনসম্মুখে আসা থেকে বিরত রাখতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
জাতীয় দিবসের ক্রোড়পত্রে রাষ্ট্রপতির ছবি ও বাণী প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়াকেও তিনি একই কৌশলের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষ্যে, দেড় বছরের এই সময় ছিল সাংবিধানিক অবস্থান, রাজনৈতিক সমীকরণ ও ব্যক্তিগত দৃঢ়তার এক কঠিন পরীক্ষা। নানা চাপ ও উদ্যোগের মধ্যেও তিনি দায়িত্বে অবিচল ছিলেন—এটিই তাঁর দাবি। তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাই টিকে গেছে।
