১৫ মাস পর তদন্ত প্রতিবেদন: প্রেমিকের প্ররোচনায় আত্মহত্যা করেন জবি শিক্ষার্থী প্রত্যাশা

পলি আক্তার, জবি প্রতিনিধি

প্রেমিক ইয়াছিনের ধারাবাহিক মানসিক নিপীড়নের অভিযোগ মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (সংগীত বিভাগের ১০ম ব্যাচের) প্রত্যাশা। অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত, এরই মধ্যে হৃদরোগে মারা গেছেন অভিযুক্ত ইয়াছিন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী প্রত্যাশা মজুমদার অথৈয়ের আত্মহত্যার প্রায় ১৫ মাস পর তদন্ত শেষ করে তার প্রেমিক ইয়াছিন মজুমদারের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। তদন্তে ইয়াছিনের ধারাবাহিক মানসিক নিপীড়নকে আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগপত্র দাখিলের পর অভিযুক্ত ইয়াছিন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল রাজধানীর সূত্রাপুরের লক্ষ্মীবাজারের নন্দলাল লেনের একটি বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন প্রত্যাশা মজুমদার অথৈ। পরদিন তার বাবা প্রণব মজুমদার সূত্রাপুর থানায় ইয়াছিন মজুমদারের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলার পরদিনই লালবাগের একটি রেস্তোরাঁ থেকে ইয়াছিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কয়েক মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। তবে আদালতে হাজির না হওয়ায় গত ২৬ এপ্রিল তার জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রাপুর থানার এসআই আলমগীর হোসেন তদন্ত শেষে গত ১৯ মে ইয়াছিনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে গত ১৪ জুলাই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসান শাহাদাত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, "প্রত্যাশা ও ইয়াছিন চট্টগ্রামের একই এলাকায় বেড়ে ওঠেন এবং একই স্কুলে পড়াশোনা করতেন। দীর্ঘদিন একতরফাভাবে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ঢাকায় আসার পর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু সম্পর্কের পর ইয়াছিন নিয়মিত মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রত্যাশাকে অপমানজনক ভাষায় কথা বলতেন এবং মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন।"

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ঘটনার দিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত উৎসবের মহড়া নিয়ে দুজনের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে মেসের সামনে ইয়াছিন প্রত্যাশাকে গালাগাল ও অপমান করেন। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আলমগীর হোসেনের ভাষ্যমতে, ধারাবাহিক মানসিক নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে ওই দিন বিকেলে প্রত্যাশা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী সুমন কুমার রায় বলেন, "সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় ইয়াছিনের মোবাইল ফোনে দুজনের ব্যক্তিগত একটি ছবি পাওয়া যায়। অভিযোগ অনুযায়ী ঐ ছবি দেখিয়ে ইয়াছিন প্রত্যাশাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন এবং দীর্ঘদিন মানসিকভাবে নির্যাতন চালাতেন। এসব বিষয় অভিযোগপত্রে আত্মহত্যায় প্ররোচনার উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।"

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আবু বক্কর ছিদ্দিক জানান, 'ইয়াছিন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন এবং কয়েক দিন আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। বিষয়টি পরবর্তী শুনানিতে আদালতকে জানানো হবে।'

এদিকে প্রত্যাশার বাবা প্রণব মজুমদার বলেন, মেয়েকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। তিনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।