আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৎপর হয়ে উঠছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এরই ধরাবাহিকতায় টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে অবৈধভাবে বন বিভাগের জায়গা দখল করে ক্লাবঘর বানিয়ে তারা সাংগঠনিক কার্ক্রমকে গতিশীল করে তুলছে। অভিযোগ উঠেছে, বনের ভেতর থেকেই নিষিদ্ধ ওই সংগঠনের নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সরকারবিরোধী অপপ্রচার চালাচ্ছে। একইসঙ্গে তারা দখল-চাঁদাবাজিতেও জড়িয়ে পড়ছে। আর এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মদদ দিচ্ছে কিছু স্থানীয় বিএনপির অসাধু নেতাকর্মী। বন বিভাগের কর্মকর্তা বলেছেন, বন বিভাগের জায়গা দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মানের কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া ক্লাবঘর নির্মানে কোনো ব্যাক্তি বা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কাউকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অচিরেই তদন্ত সাপেক্ষে অভিযান চালিয়ে তা উচ্ছেদসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে টাঙ্গাইল-৭ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য বলেছেন, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে কাউকেই বলা হয়নি। দলের কেউ যদি জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ও প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাঁশতৈল রেঞ্জের আওতাধীন বন বিভাগের জমি ও আজগানা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে বনের জায়গা অবৈধভাবে দখল করে নির্মিত হচ্ছে রাজনৈতিক কার্যালয় ও ক্লাব ঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা। বনের মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে। এতে বনাঞ্চল উজার হয়ে ভারসাম্য হারাচ্ছে পরিবেশ।
আজগানা ইউনিয়নের তথ্য বলছে, এ ইউনিয়নের মোট আয়তন ১০,৭৭৫ একর বা ৪৩.৬০ বর্গ কিলোমিটার। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এ বনে রয়েছে শাল, গজারি ও আকাশমনি ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ।
অপর একটি সূত্র জানায়, মির্জাপুরের আজগানা ইউনিয়নের আজগানা, হাঁটুভাঙা, কুড়িপাড়া, বেলতৈল ও চিতেশ্বরী এলাকায় বন বিভাগের দুই হাজার ২৯৭ একর জমি রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে আগে লোকজন ঘর তুললেও তা আটিয়া অধ্যাদেশের আওতায় রয়েছে। তবে গত কয়েক বছরে ঘর তোলার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ইউনিয়নটিতে বন বিভাগের প্রায় ৬১৭ একর জমি জবরদখলে রয়েছে। যেখানে আট বছরে নতুন করে দুই শতাধিক বাড়ি করা হয়েছে। এগুলোসহ ইউনিয়নটিতে প্রায় চার হাজার বাড়ি জবরদখলকৃত জায়গায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকারবিরোধী অপপ্রচার ও দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে পতিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সম্প্রতি তারা নিরাপদ জোন হিসেবে চিতেশ্বরী গ্রামের শালবনকে বেছে নিয়ে ইতোমধ্যে রাতের আঁধারে ক্লাবঘর তৈরি করে দখল-চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা আরও জানান, চিতেশ্বরী গ্রামের বাসিন্দা সিদ্দিক মিয়ার ছেলে এমারত হোসেন কানাডা প্রবাসী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় বসবাস করছেন। তার অনুপস্থিতিতে বসতঘরের সামনের বন বিভাগের জায়গায় ক্লাবঘরের নামে স্থাপনা নির্মাণ করছে পতিত আওয়ামী লীগের দোসররা।
বন বিভাগের জায়গায় চিতেশ্বরী গ্রামে ঘরবাড়ি নির্মাণের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে এলাকার সরকারি দলের রাজনৈতিক নেতা এবং বন বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তার বিরদ্ধে। এতে করে বনবিভাগের কর্মকর্তারা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলামের স্ত্রী আছমা বেগম জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর এ পর্যন্ত বন বিভাগের জায়গার পাহাড়ের উঁচু-নীচু ঢালে অবৈধভাবে অর্ধশত স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনা তুলতে ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতা সহযোগিতা করছেন। এছাড়া ফরেস্ট গার্ডসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকেই টাকাও নিয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আজগানা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের ছত্রছাঁয়ায় পতিত আওয়ামী লীগের দোসর স্থানীয় রুবেল, আসাদ ও জাহাঙ্গীর ক্লাবের নামে কানাডা প্রবাসী এমারতের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। চাঁদার টাকা না দেওয়ায় তারা প্রবাসী এমারতের বসতঘরের সামনে বন বিভাগের জায়গা দখল করে রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ও স্থাপনা নির্মাণ এবং এমারতের জায়গা দখলের পাঁয়তারা করছেন। বিষয়টি নিয়ে কানাডা প্রবাসীর স্বজনসহ স্থানীয়রা উদ্বিগ্ন। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রকৃত মালিকানা যাচাই এবং দখল করা জায়গা দখলমুক্ত করার দাবিও জানান এলাকার সচেতনমহল।
স্থানীয়দের দাবি, জমিটির মালিকানা ও বন বিভাগের জায়গা কি না—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে জাকির হোসেন ও জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক তাদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মুঠোফোনে অভিযুক্ত রুবেল ও আসাদ জানান, তারা কেউ কানাডা প্রবাসী এমারতের কাছে চাঁদা দাবি করেননি। তাদের ক্লাবের মাধ্যমে এলাকায় বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। পতিত সরকারের কর্যকলাপের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা জানান, মির্জাপুরের সাবেক দুই সংসদ সদস্য এবং টাঙ্গাইল-৭ আসনের বিএনপির মনোনীত বর্তমান সংসদ সদস্যও ক্লাবের এ বিষয়ে অবগত রয়েছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল বন বিভাগের ডেপুটি ফরেস্ট অফিসার মো. নাজমুল আলম বলেন, গত ৩ আগস্ট আমি এখানে যোগদান করেছি। বিষয়টি আমার জানা নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বন বিভাগের জায়গা দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মানের কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া ক্লাবঘর নির্মানে কোনো ব্যাক্তি বা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের কাউকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অচিরেই তদন্ত সাপেক্ষে অভিযান চালিয়ে তা উচ্ছেদসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল-৭ আসনের বিএনপির এমপি আবুল কালাম আজাদ বলেন, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে কাউকেই বলা হয়নি। দলের কেউ যদি আমার নাম ভাঙিয়ে বনের জায়গায় কোনো স্থাপনা বা কোনো ক্লাবঘর তৈরি করে থাকেন, তাহলে আমি বলবো - আগে অবৈধ সেই স্থাপনা ভেঙে আমাকে খবর দিতে। দখল-চাঁদাবাজির সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় ও প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টাঙ্গাইল -৭ আসনে দখল-চাঁদাবাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত কাউকে ছাড় দেওয়া হবেনা।
