কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো মানুষকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করায়, যেখানে ব্যক্তিগত জীবন আর ব্যক্তিগত থাকে না।
সেই ইতিহাসের এক কঠিন বাঁকে দাঁড়িয়েই রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
আজ ১৫ আগস্ট তাঁর ৮২তম জন্মবার্ষিকী। তবে এটি এমন এক জন্মদিন, যেখানে প্রিয় নেত্রীকে ঘিরে নেই তাঁর নিজের উপস্থিতি। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর পর এটাই প্রথম জন্মবার্ষিকী। বিএনপি দিনটি পালন করছে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের মধ্য দিয়ে।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতির মঞ্চে
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল না কোনো পরিকল্পিত রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দিয়ে।
১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হলে খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন দেশের ফার্স্ট লেডি। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তাঁর জীবনে আসে আমূল পরিবর্তন।
স্বামীর মৃত্যুর পর সামনে ছিল দুটি পথ—নীরবে ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে যাওয়া, অথবা দেশের রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় প্রবেশ করা।
খালেদা জিয়া দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন।
১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হন। এরপর ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং ১৯৮৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন।
সেখান থেকেই শুরু হয় এক গৃহবধূর রাজনৈতিক নেত্রী হয়ে ওঠার দীর্ঘ যাত্রা।
এরশাদবিরোধী আন্দোলন: ‘আপসহীন’ পরিচয়ের জন্ম
আশির দশকের বাংলাদেশ ছিল সামরিক শাসনের সময়।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন যখন তীব্র হতে থাকে, খালেদা জিয়া তখন বিএনপির নেতৃত্বে সামনে থেকে আন্দোলন পরিচালনা করেন।
বারবার গ্রেপ্তার, গৃহবন্দিত্ব, রাজনৈতিক চাপ—কোনোটিই তাঁকে রাজপথ থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি।
১৯৮৬ সালের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনও বিএনপি বর্জন করে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে যায় একটি বিশেষ পরিচয়—‘আপসহীন নেত্রী’।
১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী গণআন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ।
একজন রাজনৈতিক নবাগত নারী তখন ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছেন জাতীয় নেতৃত্বে।
১৯৯১: ইতিহাসের নতুন অধ্যায়
এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে।
আর সেই বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তৈরি হয় নতুন অধ্যায়।
খালেদা জিয়া হন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
একজন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী হিসেবে যাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের শুরু, তিনিই কয়েক বছরের ব্যবধানে নিজস্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশের সরকারপ্রধানের আসনে বসেন।
তাঁর প্রথম সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায় বাংলাদেশ। একই সময়ে শিক্ষা ও অর্থনীতিতে বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ক্ষমতার বাইরে থেকেও নেতৃত্ব
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক গল্প শুধু ক্ষমতায় থাকার গল্প নয়।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রী হন। পরে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ের পর আবার প্রধানমন্ত্রী হন।
২০০১ থেকে ২০০৬—এই সময়টি ছিল তাঁর দ্বিতীয় দীর্ঘ মেয়াদের সরকার।
অর্থনীতি, নারীশিক্ষা, অবকাঠামো ও প্রশাসন—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর সরকারের নানা উদ্যোগ যেমন আলোচিত হয়েছে, তেমনি তাঁর শাসনামল নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ, দুর্নীতির অভিযোগ ও বিতর্কও ছিল প্রবল।
অর্থাৎ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার একমাত্রিক নয়। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্রের সংগ্রামের প্রতীক; সমালোচকদের কাছে তাঁর শাসনামলও ছিল নানা বিতর্কে ঘেরা।
কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন—বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথে তাঁর প্রভাব ছিল গভীর।
১/১১ এবং কারাবন্দিত্ব
২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনীতি প্রবেশ করে আরেক অস্থির অধ্যায়ে।
২০০৭ সালের ১/১১-এর পর জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন। প্রায় এক বছর তাঁকে কারাগারে থাকতে হয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির পরাজয়ের পর শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ বিরোধী-পর্ব।
এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন, রাজনৈতিক আন্দোলন, মামলা এবং ২০১৮ সালে কারাবন্দিত্ব—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনের শেষ রাজনৈতিক অধ্যায় ছিল সংগ্রাম ও প্রতিকূলতায় পূর্ণ।
২০২০ সালে শর্তসাপেক্ষে কারামুক্তির পর তিনি দীর্ঘ সময় অসুস্থতার কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন এবং চিকিৎসা নিয়েছেন।
কেন তিনি ‘আপসহীন’?
খালেদা জিয়ার ‘আপসহীন’ পরিচয় মূলত তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে।
সমর্থকদের ভাষায়, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে শুরু করে দীর্ঘ রাজনৈতিক চাপ, কারাবন্দিত্ব এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই—
যে নারী রাজনীতিতে এসেছিলেন স্বামীকে হারানোর পর, তিনিই একসময় নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তিশালী নারী নেত্রী হয়ে উঠলেন।
তিনি শুধু জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে থাকেননি। তিনি নিজের নামে একটি রাজনৈতিক অধ্যায় তৈরি করেছেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় মারা যান খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুর পর জানাজায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের জনসম্পৃক্ততার একটি বড় প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। পরে তাঁকে তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমানের সমাধির পাশে দাফন করা হয়।
আজ, ১৫ আগস্ট ২০২৬—তাঁর ৮২তম জন্মবার্ষিকীতে বিএনপি দেশজুড়ে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেছে।
একটি জীবনকে যদি কয়েকটি শব্দে বলা হয়, তাহলে হয়তো বলা যায়—
স্ত্রী থেকে নেত্রী।
নেত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী থেকে বিরোধী দলের মুখ।
আর শেষ পর্যন্ত—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘস্থায়ী চরিত্র।
খালেদা জিয়ার গল্প তাই শুধু একজন রাজনীতিকের গল্প নয়।
এটি এমন এক নারীর গল্প, যিনি রাজনীতিতে আসার জন্য জন্মাননি—কিন্তু ইতিহাস তাঁকে রাজনীতির কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছিল।
আর সেই জায়গা থেকে তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন দৃঢ়তা, সংঘাত, পরাজয়, প্রত্যাবর্তন এবং রাজনৈতিক প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে।
তাই ইতিহাসের পাতায় তাঁর পরিচয় শুধু ‘একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী’ হিসেবে নয়—বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করা এক দীর্ঘস্থায়ী নারী নেতৃত্ব হিসেবে।
