মোল্লাহাটে কৃষকের দুর্ভোগ, সেচ সংকটে হুমকির মুখে বোরো ধান

মোল্লাহাট প্রতিনিধি 

বোরো মৌসুমে ডিজেলের তীব্র সংকট ও খোলাবাজারে উচ্চমূল্যের কারণে বাগেরহাটের মোল্লাহাটে সেচ নিয়ে কৃষকেরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিস্তীর্ণ জমিতে সময়মতো পানি দিতে না পারায় ধানের চারা ফেটে যাচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রখর রোদে ফসলের জমি ফেটে চৌচির, পুকুর ও খাল-বিলের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র সেচ সংকট। চড়া দামে তেল কিনেও পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে কৃষকদের জন্য।

শনিবার (৪ এপ্রিল) সরজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলা জুড়ে ডিজেলচালিত সেচপাম্পের ওপর নির্ভরশীল কৃষকেরা এমন সংকটে পড়েছেন। প্রতিদিন তেলের পাম্প ও খুচরা দোকানে ঘুরেও তাঁরা তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের চাপের কারণে কৃষকদের জন্য তেল পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এভাবে আর কয়েক দিন সেচ দিতে না পারলে বোরো আবাদে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। ফলে প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মোল্লাহাট উপজেলায় প্রায় ৮ হাজার ৪০৪ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে।সেচ কাজের জন্য উপজেলায় ডিজেলচালিত ৫ হাজার ৬০০ সেচপাম্প রয়েছে।

উপজেলার গাড়ফা, বাসুড়িয়া, গিরিসনগর, আস্তাইল, শিংগাতী সহ বেশ কিছু এলাকা মধুমতি নদীর তীর ঘেঁষে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। চোখ যত দূর যায়, শুধুই ধানখেত। এসকল ধানখেতের পানির একমাত্র ব্যবস্থা সেচ পাম্প। এসকল ডিজেলচালিত সেচপাম্প এমনভাবে পড়ে আছে যেন বহুদিন ধরেই এর কোনো কাজ নেই। ধানক্ষেতের পাশে বসে থাকা কৃষকের মুখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। কাছে গিয়ে দেখা যায়, পাম্প চালু করার মতো তেল নেই। পানির অভাবে ধানের চারা ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে হয়ে পড়ছে।

উপজেলার গিরিশনগর গ্রামের কৃষক সাকিব আল হাসান বলেন, প্রচণ্ড রোদে নিয়মিত সেচ দিতে হয়। কিন্তু পুকুরের পানি প্রায় শুকিয়ে গেছে, খাল-বিলেও পানি নেই। এ অবস্থায় সেচ দেওয়া খুবই জরুরি। যদি তেলের তীব্র সংকট দেখা দেয়, তাহলে আমাদের সেচ কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

চর কুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা রুবেল খান বলেন, প্রচণ্ড রোদে ঘেরের পানি শুকিয়ে গেছে। ফলে ধানে সেচ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি সবজির জমিতেও নিয়মিত পানি দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা খুবই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি।

কাহালপুর গ্রামের কৃষক হেদায়েত মোল্লা জানান, তিনি ৫ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। তাঁর নিজের একটি ডিজেলচালিত সেচপাম্প রয়েছে, যার আওতায় আরও ৭ জন কৃষকের প্রায় ১০ বিঘা জমিতে তিনি পানি দিয়ে থাকেন। কিন্তু জ্বালানি তেলের সংকটে এখন সেই পাম্পই প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, তেলের অভাবে ঠিকমতো আবাদই করতে পারছি না। এক দিন কোনোভাবে পানি দিতে পারলেও পরের সাত দিনেও আবার সেচ দিতে পারি না। প্রতিদিনই তেলের পাম্পে ঘুরছি। কোনো দিন যদি তেল দেয়ও, তখন মাত্র দুই লিটার দেয়। অথচ আমার প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লিটার তেল লাগে। এই সামান্য তেলে কোনোভাবেই কাজ চলে না। পানির অভাবে আমাদের ধানখেত শুকিয়ে যাচ্ছে, একপ্রকার মরে যাচ্ছে। তেলের জন্য দিনভর ছোটাছুটি করছি, কিন্তু পাম্প থেকে পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছি না। দোকান থেকে তেল নিলে চড়াও দামে তেল কিনতে হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার চুনখোলা, আটজুড়ী, গাওলা, কোদালিয়া, কুলিয়া, গাংনী ইউনিয়নে একই অবস্থা বিরাজ করছে। ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভরশীল অধিকাংশ কৃষকই পড়েছেন চরম সংকটে।

কৃষকদের দাবি, দ্রুত সেচের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে চলতি মৌসুমে ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

মা ফিলিং ফলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন জানান, চাহিদা তুলনায় ডিপো থেকে তেল পাচ্ছি খুব ই নগণ্য। পরিবহন সেক্টর চালু রাখতে গেলে কৃষি সেক্টর বন্ধ হয়ে যায়, কৃষি সেক্টর চালাতে গেলে পরিবহন সেক্টর বন্ধ হয়ে যায়। ডিপো থেকে একদিন পর একদিন তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় মাত্র ৩০ শতাংশ।

তিনি আরো জানান, জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর বরাদ্দ বৃদ্ধির আবেদন করে ডিপোতে পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন সুরাহা আমরা পাইনি।

এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৃষকদের সাশ্রয়ী সেচ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ ও পানি সংরক্ষণে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ সুমনা আইরিন ইনকিলাবকে বলেন, পাম্পে শৃংখলার মধ্য দিয়ে তেল বিক্রির কার্যক্রম চলছে। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে উপজেলা প্রশাসন তদারকি করে যাচ্ছে। সমস্যা হলো, পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের ব্যাপক ভিড় থাকে। সেগুলোর কিছু করতে গেলেই, আবার বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কৃষকদের বিষয়টি নিয়ে আমরা আলাদাভাবে চিন্তা করছি। কৃষকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁদের তেল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে যাতে বোরো চাষের কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়।