বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই অন্যরকম আবেগ, উত্তেজনা আর উন্মাদনা। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মতোই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শিক্ষার্থীদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বকাপের রঙিন আবহ। ক্যাম্পাসের আবাসিক হল, চায়ের দোকান, বাস, ক্যাফেটেরিয়া থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবখানেই এখন ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক আর আনন্দমুখর পরিবেশ।
বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ১১ জুন ২০২৬। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—এই তিন দেশ যৌথভাবে আয়োজন করবে এবারের বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টের পর্দা নামবে ১৯ জুলাই ফাইনালের মধ্য দিয়ে। ৪৮ দল নিয়ে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপ ঘিরে ইতোমধ্যেই ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক উন্মাদনা।
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রিয় দল নিয়ে চলছে নানা প্রস্তুতি। কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা, আবার কেউ ফ্রান্স, পর্তুগাল কিংবা জার্মানির সমর্থনে ক্যাম্পাসে উড়াচ্ছেন প্রিয় দলের পতাকা। অনেক হলের বারান্দা, রুম ও করিডোরে দেখা যাচ্ছে প্রিয় দলের জার্সি, ব্যানার ও পোস্টার।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিনই দেখা যায় শিক্ষার্থীদের ফুটবল আড্ডা। কে জিতবে বিশ্বকাপ, কোন খেলোয়াড় এবার সবচেয়ে বেশি গোল করবেন কিংবা কোন দল ফাইনালে উঠবে এসব নিয়ে চলে প্রাণবন্ত আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ট্রল, মিম ও বন্ধুত্বপূর্ণ খুনসুটি।
বিশ্বকাপ ঘিরে বিভিন্ন আবাসিক হলে আয়োজন করা হবে খেলা দেখার বিশেষ ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে বসে খেলা উপভোগ করতে প্রজেক্টর ও বড় স্ক্রিনের ব্যবস্থা করার কথা বলেছে ছাত্রদলসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর এন্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আল শাহরিয়া শুভ বলেন, "আমি যখন ক্যাম্পাসে নবীন তখনই ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময়ে খেলা নিয়ে বিভিন্ন দলের সাপোর্টারদের উন্মাদনা, মিছিল,তর্ক-বিতর্ক সবকিছুই খুবই উপভোগ করেছি। আমরা রবীন্দ্র ভবনের সামনে বড় পর্দায় খেলা দেখতাম। সেখানে শিক্ষার্থীদের ফুটবল উন্মাদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। তবে গতবার ব্রাজিল বাদ পড়ায় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আশা করি এবার সেই কষ্টটা লাঘব হবে। ব্রাজিল তাদের চেনা ছন্দে ফিরবে এবং চ্যাম্পিয়ন হবে। বিশ্বকাপ উন্মাদনায় রাবিয়ানরা আবারও মেতে উঠবে"
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম সৌরভ বলেন, "আসন্ন বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ক্লাসের ফাঁকে কিংবা টংয়ের দোকানে বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা, প্রিয় দলের জার্সি পরা, এসব মুহূর্ত বিশ্বকাপকে আরও উপভোগ্য করে তোলে। আমি আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দল-এর সমর্থক হিসেবে লিওনেল মেসি ও অ্যানজেল ডি মারিয়ার খেলা সবসময় উপভোগ করি। মেসির নেতৃত্বে ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা ভালো কিছু করবে বলে আমি প্রত্যাশা রাখি "
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী মো.সাকিন হোসেন বলেন, আসলে ক্যাম্পাস জীবনে প্রথমবারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপের আবহ অনুভব করতে পারাটা আমার কাছে সত্যিই বিশেষ এক অনুভূতি। ছোটবেলা থেকেই বিশ্বকাপ দেখার প্রতি আলাদা একটা আগ্রহ ছিল, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে বন্ধুদের সঙ্গে একসাথে এই উন্মাদনার অংশ হতে পারাটা অনেক বেশি আনন্দের। সামনের বিশ্বকাপকে ঘিরে ইতোমধ্যেই রাবি ক্যাম্পাসে ভিন্নরকম এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। প্রিয় দলের জার্সি পরে ঘোরাঘুরি, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা নিয়ে আলোচনা, কে কোন দল সাপোর্ট করে তা নিয়ে মজার তর্ক, সব মিলিয়ে পুরো বিষয়টা অনেক উপভোগ করছি। বলে রাখা ভালো, আমার প্রিয় দল হলো পর্তুগাল এবং প্রিয় খেলোয়াড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্দো ।
ইতিহাস বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো.রায়হানুল ইসলাম রাহী বলেন, দীর্ঘ চার বছর পর ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আয়োজন ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নিতে না পারলেও দেশের ফুটবলপ্রেমীরা নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড় ও দলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই বিভিন্ন দলকে সমর্থন করে। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় এবং লিওনেল মেসির স্বপ্নপূরণ ছিল আমাদের জন্য দারুণ এক অনুভূতি। ফাইনাল ম্যাচের স্মৃতি এখনও রোমাঞ্চ জাগায়। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপও বিশেষ, কারণ এটি অনেক বিশ্বসেরা ফুটবলারের শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে। এরই মধ্যে ভক্তদের মাঝে উন্মাদনা শুরু হয়ে গেছে। এবার ক্যাম্পাসে সিনিয়র-জুনিয়র ও বন্ধুদের সঙ্গে একসাথে খেলা দেখার
আনন্দটা হবে আরও বেশি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নৌখা নোয়েল ত্রিপুরা বলেন, ২০০২ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের বছরে আমার জন্ম। ছোটবেলা থেকেই রোনালদিনহো, কাকা ও নেইমারের পায়ের জাদু দেখে বড় হয়েছি। ব্রাজিলের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সাম্বা ফুটবলের নান্দনিকতা এবং বিশ্বজুড়ে ছড়ানো প্রতিভাদের কারণেই এই দলের প্রতি আমার ভালোবাসা। আসন্ন বিশ্বকাপে নেইমারের খেলা নিয়ে মনের মধ্যে যে শঙ্কা ছিল, স্কোয়াডে তার অন্তর্ভুক্তি তা দূর করে দিয়েছে। নেইমারের উপস্থিতি কোটি ভক্তের মনে আনন্দের জোয়ার এনেছে এবং আমাদের ‘হেক্সা’ (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) জয়ের মিশনকে আরও শক্তিশালী করেছে। ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সাথে খেলা দেখার মাধ্যমে এই আনন্দটা আরও পূর্ণতা পাবে ।
সমাজকর্ম বিভাগের ২০২৪- ২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইতি শিকদার বলেন, বিশ্বকাপ শুধু একটি খেলা নয়, এটি আমাদের কাছে উৎসবের মতো। খেলার সময় বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে ম্যাচ দেখা, তর্ক করা এবং আনন্দ ভাগাভাগি করার অনুভূতিটা অসাধারণ।
শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু বিনোদন নয়, এটি ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে এক ধরনের সংযোগ তৈরি করে। ব্যস্ত একাডেমিক জীবনের মাঝেও এই আয়োজন শিক্ষার্থীদের মাঝে এনে দেয় বাড়তি প্রাণচাঞ্চল্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ।
সব মিলিয়ে, বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে ক্যাম্পাস এখন যেন এক টুকরো বৈশ্বিক ফুটবল মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের আবেগ ও উৎসবের নাম। তাই দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ফুটবলপ্রেমীদের উত্তেজনা।
